ফলহারিনী কালীপুজার রহস্য

কালীপুজার রহস্য জগজ্জননী মহাশক্তিকে যে – সকল মূর্তিতে আরাধনা করা হয় , কালীরূপ তাদের অন্যতম।তন্ত্রমতে কালী আদিরূপিণী আদ্যাশক্তি , সবকিছুরই কারণ । ইচ্ছামাত্রে তিনি এই চরাচর বিশ্ব সৃষ্টি করছেন । আবার প্রলয়কালে তিনিই সংহার করছেন । জগৎসংহারক মহাকাল তারই একটি রূপমাত্র । মহাকাল বিশ্ব গ্রাস করেন । আর তিনি গ্রাস করেন মহাকালকে । তাই তিনি কালী । সগুণ ব্রহ্মের সৃষ্টি , স্থিতি ও বিনাশ — এই তিন ভাবের একত্র প্রকাশ কালীরূপের বৈশিষ্ট্য । কালীরূপও অনেক । “ তিনিই মহাকালী , নিত্যকালী , শ্মশানকালী , রক্ষাকালী , শ্যামাকালী । ” ফলহারিণী এই বহুরূপিণী কালীরই অন্যতম একটি রূপ ।


সাধকের কর্মফল হরণ করেন , তাই তিনি ফলহারিণী । আর সেজন্যই বােধহয় কর্মফলের প্রতীক হিসেবে দেবীকে নানাবিধ ফল নিবেদন করা পুজার বিধানে আছে । জ্যৈষ্ঠ মাসের কালীপুজার রহস্য অমাবস্যায় সাধক নানাবিধ ফলের উপহার সহযােগে দেবীর পুজা করেন । অপর একটি বিধানেও উক্ত মতের সমর্থন পাওয়া যায় । সেখানে আছে , জ্যৈষ্ঠমাসের অমাবস্যায় বিশেষভাবে নানাবিধ ফল দিয়ে কালিকাদেবীর পুজা করতে হয় । এভাবে ফল নিবেদনের একটি বাহ্য ব্যবহারিক দিকও আছে । জ্যৈষ্ঠমাস আমাদের দেশে আম , জাম , লিচু , কাঁঠাল ইত্যাদি ফলের মরসুম । সাধক নিজের ইষ্টদেবীকে — যিনি আপনার হতেও আপনার , জীবনের সর্বস্ব , তাকে এই সময় সময়পযােগী উপাদেয় নানাবিধ ফল দিয়ে আপ্যায়িত করবেন , এটা খুবই স্বাভাবিক । যাই হােক , দেবী একদিকে যেমন ফলহারিণী , সাধকের কর্মফল হরণ করেন , বিনাশ করেন , অপরদিকে আবার ফলদায়িনীও । কর্মফল হরণ করে সাধককে তার অভীষ্টফল , মােক্ষফল প্রদান করেন । | ফলহারিণী কালী পুজা হয় জ্যৈষ্ঠমাসের অমাবস্যার মহানিশায় । জ্যৈষ্ঠমাসের অমাবস্যার মহানিশায় সাধক নানাদ্রব্যের উপহার সহযােগে শ্রীশ্রীকালিকাদেবীর পুজা করেন । উক্ত তন্ত্রেই আবার এই পূজার অন্যরূপ বিধানও আছে । — সেই মাসেরই ( জ্যৈষ্ঠমাসের ) পূর্ণিমার অর্ধরাত্রে লক্ষফল উপচারে অসমর্থ হলে যথাশক্তি ফল নিবেদনপূর্বক কালিকাদেবীর পুজা করা হয় । দ্বিবিধ বিধান থাকলেও প্রথমােক্ত বিধানেই অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠমাসের অমাবস্যায় পুজার রীতিই বহুল প্রচলিত ।
শ্রীরামকৃষ্ণ – সঙ্ঘে ফলহারিণী কালীপুজা মহা সমারোহে পালন করা হয় এবং এই দিনটির একটি বিশেষ তাৎপর্য আছে কারণ ১২৮০ সালের ফলহারিণী পুজার পুণ্য দিনটিতে শ্রীরামকৃষ্ণ তার সাধক জীবনের একটি বিশেষ ব্রত উদযাপন করেন । ব্রতটি উদযাপিত হয় বিচিত্র এক পুজানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে । ঐদিন তিনি শ্রীশ্রীমা সারদাদেবীকে ষোড়শীরূপে পুজা করেন এবং সাধনার ফল এবং জপের মালা প্রভৃতি সর্বস্ব শ্রীশ্রীদেবীপাদপদ্মে প্রদান করে মন্ত্রোচ্চারণ করে তাহাকে প্রণাম করেন । এই দিনে কালীপুজা তাে হয়ই,তবে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কর্তৃক বিদ্যারূপিণী শ্রীশ্রীমা সারদাদেবীর আদ্যাশক্তিকে ষোড়শীরূপে পুজা করার বিচিত্র এই ঘটনাই ফলহারিণী কালীপুজাকে শ্রীরামকৃষ্ণ – সঙ্ঘে একটি বিশেষ তাৎপর্য এনে দিয়েছে । আর শ্রীরামকৃষ্ণের ষোড়শী পুজার পূণ্য এই ঘটনার অনুসরণে শ্রীশ্রীমা সারদাদেবীকে স্মরণ করে কালীপুজার যে এই দিনটির প্রধান আর্কষণ , তা বলা বাহুল্য । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে , ষোড়শী দশমহাবিদ্যার অন্যতম রূপ ।

আরো পড়ুন ঃ Ten Best Vastu Tips For Your Home By Dr. Debashish Goswami

তন্ত্র – সাধনকালে শ্রীরামকৃষ্ণ জগন্মাতার বহু প্রকার মূর্তির দর্শনলাভ করেছিলেন । সে – প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন , “ ঐ মূর্তিসমূহের সকলগুলিই অপূর্ব সুন্দর হলেও শ্রীশ্রীরাজরাজেশ্বরী বা ষোড়শী মূর্তির সৌন্দর্যের সঙ্গে তাহার রূপের তুলনা হয় না । আরও বলতেন , ষোড়শী বা ত্রিপুরামূর্তির অঙ্গ হইতে রূপ – সৌন্দর্য গলিত হইয়া চর্তুদিকে পতিত ও বিচ্ছুরিত হইতে দেখিয়াছিলাম । কালীর ফলহারিণীরূপের কোন ধ্যানমন্ত্র বা পৃথক পুজাবিধি নেই । “ অর্ধরাত্র পুজার মুখ্য কাল ,অন্যান্য বহুবিধ উপচার নিবেদনের সঙ্গে নানাবিধ গােটা ফল দেবীকে নিবেদন করাই এই পুজার বৈশিষ্ট্য ।
তাই ফলহারিণী কালীপুজার দিনটি শ্রীরামকৃষ্ণ – সঙ্ঘে বিশেষ তাৎপর্যবহ একটি ঐতিহাসিক স্মরণীয় ও বরণীয় দিন।

Read Free Astrology Magazine 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x
Translate »